উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আইলার ১০ বছর আজ ত্রাণ নয়,বেঁচে থাকার টেকসই বেড়িবাঁধ চাই!

37

শাহীন গোলদার,সাতক্ষীরা

উপকূলীয় এলাকায় আইলার ক্ষত আজও শুকায়নি। ১০ বছর আগে ২০০৯ সালের ২৫ মে সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াস ও ঘুর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা “আইলা” আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলীয় জনপদে। মুহুর্তেই শ্যামনগর, আশাশুনি ও খুলনা জেলার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার উপকুলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘর-বাড়িসহ কয়েক হাজার মানুষকে। প্রাণ হারায় ৬৭ জন। সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন যাপন এখন আরো দূর্বিসহ হয়ে পড়েছে। আইলার পর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের কাজ হলেও এখন আর কোনো কাজ নেই। ক্রমেই বাড়ছে দরিদ্রের সংখ্যা। নেই সুপেয় খাবার পানির নিজস্ব ব্যবস্থা। উপকুলীয় এলাকা প্রতাপনগর,গাবুরা,পদ্মপুকুর নদীবেস্টিত এলাকা। লবনপানিতে চিংড়ীচাষীদের কারণে উপকুলজুড়ে এখন বৃক্ষশুন্য। এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ি বাঁধগুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় প্রায় আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পানি ঢুকে পড়ছে। আর অনেক পরিবার যেমন পুনর্বাসনের সুযোগ পায়নি। তেমনি পাঠদানের অনুপযোগি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ঢের। উপকুলবাসীর প্রাণের দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ ও নির্মাণ করা হোক প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাইক্লোন শেল্টার। ওই সময় ঘূর্ণিঝড় আইলা উপকুলের আশপাশের জেলার মত ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। আইলার প্রভাবে নিঝুম দ্বীপ এলাকার সকল পুকুরের পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়েছিলো। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্থ হয়ে পড়ে। যার ফলে লোনা পানিতে তলিয়ে যায় খুলনার দাকোপ, কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর,আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন। এতে ৭৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পুর্ণ এবং ৩৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিকভাবে ধ্বসে পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রলয়াংকারী ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্চাসে ২ লাখ একর কৃষিজমি লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। এক লাখ একর আমন ক্ষেত সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়। কাজ হারায় এলাকার কৃষক ও কৃষি-মজুররা। কাটতে থাকে অনাহারে দিন। আক্রান্ত এলাকাগুলোয় পানীয় জলের উৎস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। জলোচ্ছাস ও লোনা পানির প্রভাবে, গবাদি পশুর মধ্যে হাজার হাজার গরু ছাগল মারা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের কয়েক মাস পর থেকে এলাকাগুলোয় গাছপালা মরতে শুরু করে ও বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। আর ২ লাখ ৪৩ হাজার ঘরবাড়ি সম্পুর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে বাস্তচুত্য হয় ৩ লাখ পরিবার। এতে খুলনা ও সাতক্ষীরায় প্রাণ হারায় কয়েক শত নারী, পুরুষ ও শিশু। তবে এসকল দূর্যোগ কবলীত এলাকায় নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। আর এ কারনেই আতংকে থাকে উপকুল এলাকার মানুষরা। আজ আইলার ১০ বছর পূর্ণ হলেও এলাকার বেড়িবাঁধের ভাঙন মেরামত না হওয়ায় এখনও বছরে ২/৩ বার পানিবন্দী হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর নি¤œ এলাকার বিপুল মানুষ। কোনো কোনো গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কপোতাক্ষ আর খোলপেটুয়া নদীর পানিতে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের ইয়াছিন আলী লস্কর,হাফিজুল ইসলাম, হাসান ঢালী, বাক্কার ঢালী ও মনিরুল ইসলাম জানান, আইলার পর থেকে এপর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মান না হওয়ায় বছরে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ বার বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, মৎস্য ঘের এবং বসত বাড়ি তলিয়ে যায়। প্রতিটি মুহুর্ত্ব আতংকে থাকতে হয় কখন জানি বাঁধ ভেঙ্গে বাড়ি-ঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। “আমরা ত্রান চাই না, ভাত কাপড় নয়, বেঁচে থাকার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ চাই”। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান,এই ইউনিয়ন ৯টি ওয়ার্ডদ্বারা বেষ্টিত। এরমধ্যে ৬টি ওয়ার্ডই ভাঙ্গন এলাকায় যা সম্পুর্ণ ঝুকিপূর্ণ। এখানে পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নেই। এছাড়া স্থায়ী কোন বেড়িবাঁধ না থাকায় এমন দূর্ঘটনার স্বীকার হয় এলাকার মানুষ। তিনি এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার ও কেটসই বেড়িবাঁধের দাবি জানিয়ে বলেন, এগুলো বাস্তবায়িত হলে এলাকার ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও মানুষ দূর্যোগের আতংক থেকে মুক্ত থাকবে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো-২) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন,ডিভিশন-১ এবং ডিভিশন-২ এর আওতায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ৭০ শতাংশ বেড়িবাঁধ ঝুকিপূর্ণ। তবে ডিভিশন-২ এর ৭ কিলো মিটার বাঁধ অধিক ঝুকিপূর্ণ থাকায় সেখানে কাজ করা হচ্ছে। ৬০ বছর আগে নির্মিত এই বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে রুঘœদশায় পরিনত হয়েছে। এটি পুনরায় সংস্কার না করা হলে দূর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব না। তিনি আরও বলেন, স্থায়ী সমাধান আনতে উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। যা সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিভিশন ১ এবং ২ এর আওতায় প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মান করা হবে। যার ব্যায় আসবে ৮ হাজার ৭শ কোটি টাকা। যেটি হাইওয়ে হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। আগামী নভেম্বর ডিসেম্বর নাগাদ এই কাজ শুরু হতে পারে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন,২০০৯ সালের ২৫ মে এই দিনে ভয়ংকর জলোচ্ছ¡াস আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। সরকারি ভাবে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। শুধু উপকুলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রা মান উন্নয়ন কল্পে বেড়িবাঁধ গুলোকে নতুন ভাবে বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মন্তব্য
Loading...