জার্মানির সিটি নির্বাচনে বাংলাদেশি রাজনীতিক ইউনুস খান

212
gb

জার্মানির, মাইন্স থেকে আনসার আহমেদ উল্লাহ|| 

জার্মানির রাইনলান্ড ফালস রাজ্যের প্রাদেশিক রাজধানী মাইন্স নগরীর সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনী লড়াইয়ে লড়ছেন জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জার্মান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইউনুস আলী খান। ২৬ মে’র নির্বাচনে জয়ের আশা করছেন সিডিইউ নেতা খান।

২০১৪ সালে জার্মানির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন সিডিইউ এর পক্ষ থেকে মাইন্স সিটি কাউন্সিলের নির্বাচনে প্রথমবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে ২০ হাজার ৪৩৮ ভোট পেয়েছিলেন জার্মান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগঠন এর সভাপতি সমাজসেবী ইউনুস খান। তিনি একইসাথে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এর দল সিডিইউ এর মাইন্স নয়েস্টাট এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নৃশংসভাবে শহীদ হওয়ার পর নিজেদের শিক্ষা ও সংগ্রামী কর্মকাণ্ড হুমকির মুখে পড়ায় পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান তরুণ ইউনুস আলী খান। আজ তিনি সেই জার্মান সমাজে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে স্বীকৃত ও সম্মানিত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে তাঁর অকালে চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি ইউনুস আলী খান। তাঁর এমন শোকাবহ মৃত্যুর ঘটনা তাঁর আবেগ ও অনুভূতিকে সারাক্ষণ নাড়া দেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র বাঙ্গালি জাতির নেতা নন, বরং তিনি বিশ্বের সকল নির্যাতিত ও শোষিত জাতির নেতা। এমন মহান নেতাকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে, তাদের পক্ষে যে কোন অপকর্ম ঘটানো সম্ভব। তাই তাঁর সব খুনিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

জার্মানিতে পাড়ি জমানোর কিছুদিন পরেই জার্মানিতে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটিতে বেসামরিক প্রশাসনিক পদে চাকুরি পেয়ে যান জনাব খান। সেই থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মাইন্স এর নিকটস্থ মার্কিন সেনাঘাটিতে কর্মরত রয়েছেন তিনি। এরইমধ্যে নিজের  সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও পারদর্শিতার স্বীকৃতি স্বরূপ মার্কিন সেনাঘাটির পক্ষ থেকে তাঁকে ‘সেরা কর্মকর্তা’ হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

বিগত কয়েক দশক ধরেই বঙ্গবন্ধু তনয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন, ইটালি, যুক্তরাজ্য, তুরস্কসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সফরে যোগ দিয়েছেন। এসব সফরে এবং সম্প্রতি জার্মান আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম বশিরুল আলম চৌধুরী সাবুর সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একান্ত আলাপে মতবিনিময় করেছেন দেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের নানা দিক নিয়ে।

গণমাধ্যমের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে ইউনুস খান বলেন, “প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী নেতৃবৃন্দের সাথে একান্ত আলাপে প্রায়ই নির্দেশনা দেন আমরা যারা যেসব দেশে বসবাস করি সেসব দেশের মূলধারার সমাজের সাথে এবং রাজনীতির সাথে আমাদের জড়িত থাকার ব্যাপারে। তাই আমিও নেত্রীর নির্দেশনার কথা স্মরণ রেখে এবং বিদেশের বুকে বাংলাদেশিদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ ও মর্যাদার জন্য প্রায় এক দশক ধরে জার্মানির দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক দল সিডিইউ এর সাথে কাজ করে চলেছি। সেখানে ইতিমধ্যে আমি মাইন্স নগরীর নেতা-কর্মী এবং জনগণের মাঝে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। তাই ২০১৪ সালের নির্বাচনে অভিবাসী হওয়া সত্ত্বেও আমি প্রচুর সমর্থন পাই, তবে মাত্র কয়েকশ’ ভোটের ব্যবধানে হেরে যাই। তবুও এটি অনেক বড় সাফল্য বলেই মনে করি আমি।“

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় বিরোধীদলের ধ্বংসাত্মক এবং অসহযোগিতামূলক ঘটনাগুলো তাঁকে সবসময়ই বিচলিত করে তোলে। যে দলই বিরোধী দল হিসেবে থাকে, তারা সরকারি দলের উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি জার্মানির রাজনৈতিক ধারায় গণতান্ত্রিক রীতিনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং চর্চাকে আরও গঠনমূলক রূপ দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আদি থেকেই বিরোধীদলের ধ্বংসাত্মক এবং অসহযোগিতামূলক আচরণ চলে আসছে। যার অন্যতম ন্যাক্কারজনক ও ঘৃন্য উদাহরণ জেলহত্যা, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন সহ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো। অথচ জার্মানির রাজনৈতিক পরিবেশে খুন কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করাতো দূরের কথা প্রতিপক্ষের কোন নেতা-কর্মীর মধ্যে এতোটুকু ঝগড়া-বিবাদ কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিরোধী দল রয়েছে, ভিন্ন আদর্শের এবং ভিন্ন মতের পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে, কিন্তু তাই বলে ভিন্ন নীতি ও আদর্শকে খাটো করে দেখা কিংবা হেয় করে দেখার ঘটনা বিরল। বরং প্রতিপক্ষের বক্তব্যকেও শ্রদ্ধার সাথে বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে গঠনমূলক যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরার মতো উজ্জ্বল দৃষ্টান্তই তাদের রাজনৈতিক অনুশীলন এবং নিয়মিত চর্চা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও জার্মানির এমন চমৎকার রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত থেকে অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষা গ্রহণ করবেন এবং নিজেদের মাঝে ইতিবাচক, বন্ধুত্বমূলক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবেন।

তিনি বলেন, আগে জার্মানদের মাঝে বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে কোন ভালো ধারনা ছিল না এবং এখানে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও জার্মান সমাজের কারো সাথে মেলামেশা করতো না। তাই আমি জার্মান-বাংলা সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সাথে জার্মানদের পরিচয় ঘটিয়েছি। সমিতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মাইন্স নগরীতে আলোচনা সভা, সেমিনার, পিঠা উৎসব, সাংস্কৃতিক পরিবেশনাসহ নানা ধরণের অনুষ্ঠান করে থাকি। এসব উৎসব, প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র মাইন্স নয়, বরং আশেপাশের আরও বিভিন্ন শহর এবং এলাকা থেকে বাংলাদেশি ও জার্মান মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More