ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন পূরণ হলো না আফনানের মা-বাবার

106
gb

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ঘোরি মো. ওয়াসিম আব্বাস আফনান। তার মা-বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে, ডক্টর হবে। দেশ বিদেশে পরিবারের আলো ছড়াবে।

কিন্ত্র এক নিমিশেই সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে তাদের। ঘাতক বাস তাদের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে।

এদিকে প্রায় ১৭ বছর আগে ২০০২ সালে অনেকটা এমনভাবেই গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে বাস চাপায় মারা যান তার ছোট মামা আরিফ আহমেদ। এ দুই শোকে কাতর এখন তার পরিবার।

ছেলের মৃত্যুতে এখন আবারও ভাইয়ের মৃত্যুর সেই পুরোনো শোক মনে নাড়া দিয়ে উঠেছে আফনানের মা মীনা পারভিনের।

মঙ্গলবার নিহত ওয়াসিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, এখনও শোকে কাতর পরিবারটির সদস্যরা। কথা বলতে গিয়ে বার বারই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তার বাবা পল্লী বিদ্যুতের অবসরপ্রাপ্ত কো-অর্ডিনেটর মো. আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ছেলের লাশেও আঁচড় পড়ুক সেটি চাননি তিনি। ছেলের অক্ষত লাশ দাফন করে শান্তি পেয়েছেন। মামলা করতে চান না। অপরাধীর বিচার নিয়েও তার কোনো আগ্রহ নেই।

হবিগঞ্জের পাহাড় টিলা অধ্যুষিত নবীগঞ্জ উপজেলার রুদ্রগ্রামের বাসিন্দা পল্লী বিদ্যুতের অবসরপ্রাপ্ত কো-অর্ডিনেটর মো. আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে-মেয়ে দুইজনকেই ডক্টর বানানোর স্বপ্ন ছিল তার।

বাড়ির সামনে গেইট বানিয়ে তাতে ছেলে-মেয়েদের নাম জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন আবু জাহেদ মাহবুব। কিন্তু বিধিবাম। গত শনিবার নিজ এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে এসেই সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে।

তিনি জানান, অনুষ্ঠান শেষে বন্ধুদের সঙ্গে সিলেট ফিরছিলেন তার একমাত্র ছেলে আফনান। চড়েছিলেন সিলেট-ময়মনসিংহ রোডের উদার পরিবহন নামে একটি বাসে। ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুরে তাকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেলপার।

এখানেই শেষ নয়, তার উপর দিয়ে আবার বাস চালিয়েও নেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আফনানের। শেষ তার ডক্টর হওয়ার স্বপ্ন। তার মৃত্যুতে হয়েছে আন্দোলন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলাও করেছেন। আসামি গ্রেফতার হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে ঘটনার সত্যতা স্বীকারও করেছে।

কিন্তু মামলা বা বিচার কোনোটিই চান না তার পরিবারের সদস্যরা। আর ছেলের শোকে এখনও কথা বলতে পারছেন না নিহতের মা গজনাইপুর ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা মীনা পারভিন।

মো. আবু জাহেদ মাহবুব ঘোরী জানান, তার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করে ডক্টর বানাবেন। একই সঙ্গে একমাত্র মেয়ে তৌহুরা ইয়াসমিনকেও ডক্টর বানাতে চান। বাড়ির সামনে গেট বানিয়ে ছেলে মেয়ের নামের সঙ্গে ডক্টর দিয়ে নাম লিখতে চেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আমার ছেলে খুব মেধাবী ছিল। বড়দের খুব সম্মান করতো। তাকে নিয়ে গর্ব করতাম। ভার্সিটিতে গেলে তার সহপাঠীরা আমাকে কত সম্মান করতো। তার সঙ্গে অন্য ছাত্ররাও আমাকে পা ধরে কদমবুচি করতো। সে এত ভদ্র ছিল যা বলার মতো নয়। এজন্য সবাই তাকে খুব আদর করতো। তাকে জন্ম দিয়ে আমি গর্ভবোধ করতাম। কারো সঙ্গে কোনো সময় ঝামেলায় জড়াতো না। এ জন্য সবাই তাকে মায়া করতো।

আফনানের বাবা বলেন, মামলা করে কী হবে। আমার ছেলেতো আর ফিরে আসবে না। হয়ত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। তাতে কী হবে? সে তো আর আসবে না। এ জন্য আমি ছেলের লাশ ময়নাতদন্ত না করে নিয়ে আসি। কারণ ময়নাতদন্ত করলে তার লাশ কাটাছেঁড়া হবে। আমি অনুমতি নিয়ে এসে তার লাশ অক্ষত অবস্থায় দাফন করেছি।

আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, এ গ্রামেই তাদের আদি নিবাস। শতাধিক বছর ধরে বসবাস করছেন। তার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। আর দাদা ছিলেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।

নিহতের মামা হবিগঞ্জ পোস্ট অফিসে কর্মরত শামীম আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানান, ২০০২ সালে অনেকটা একই রকমভাবে মারা গিয়েছিল তার ছোট ভাই আরিফ আহমেদ। বাস থেকে নামতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে সে মারা যায়। তখন তারা একটি মামলাও করেছিলেন। কিন্তু কোনো ফল পাননি। তাই এখন আর ভাগ্নে হত্যার বিচার চান না। তারা মামলাও করতে চান না।

তিনি বলেন, ভাগ্নের দুর্ঘটনা আবারও আমাদের ভাইয়ের দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে। সে শোক আবারও আমাদের মনে নাড়া দিয়ে উঠেছে।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More