সততার অবক্ষয়ে সিস্টেমের আবির্ভাব

48

মানব জাতির সভ্যতার শুরুতেই বিনিময় বা আদান প্রদান রীতিনীতি কাজটি হয়ে আসছে। এ ধরণের বিনিময়ের বেশির ভাগই হয়েছে দরকার বা চাহিদার ভিত্তিতে। আমার যা নেই কিন্তু দরকার। আবার আরেকজনের যা নেই, তা আমার আছে। থাকা, না থাকা এবং দরকারের কারণে শুরু হয় বিনিময় প্রথা।

ধার নেয়া বা ধার দেয়া, কথা দেয়া এবং কথা রাখা এও বিনিময়ের মত হয়ে আসছে। মানুষ জাতি বিনিময় এবং চাহিদা পূরণ করছে বেঁচে থাকার জন্য। পরে আস্তে আস্তে মুদ্রা, কাগজের টাকা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে চাহিদার কারণে। বিনিময় পদ্ধতিতে বর্তমানে শুধু অর্থ নয়, সঙ্গে যোগ হয়েছে প্যাকেজিং, উপস্থাপনা, ভেজাল, গুঁড টু বেটার, একোলজি আরো অনেক কিছু।

আমি কাবুলীওয়ালা নই তবে বর্ণনা করব সেই সময়ের কথা, তাদের ব্যবসার পদ্ধতির কথা। আমি গ্রামীণ ব্যাংকের কেউ নই তবে তুলে ধরব তাদের ঋণ দেয়া নেয়ার পদ্ধতি। আমি মাইক্রোক্রেডিটের ওপর এক্সপার্ট নই তবে বলব কিছু উদাহরণ তার ওপর। আমি স্টকহোল্ডার নই তবে জানি বিষয়টি সম্বন্ধে। আমি সুদখোর নই তবে জানি তাদের কর্মের ধরণ। আমি ফেরিওয়ালা নই তবে দেখেছি তাদের বিক্রির পদ্ধতি। আমি আমেরিকান নই তবে শিখেছি তাদের প্যাকেজিং পদ্ধতি। আমি জাপানিজ নই তবে জেনেছি তাদের গুঁড টু বেটার থিওরি। আমি বাংলাদেশি বংশদ্ভূত এক সুইডিস। আমি বর্তমান যুগে সমন্বয়ের মাধ্যমে গড়ে ওটা বিশ্ব মানব জাতির একজন। কাবুলীওয়ালা: দিয়ে গেছে মাল দুয়ারে এসে।

সময় মত এসেছে পাওনা নিতে যে কথা হয়ে ছিল তাদের মাঝে। বিশ্বাস ছিল তখনকার দিনে। গ্রামীন ব্যাংক: বলছে ১০০ টাকা ধার দিলাম, ১০ টাকা কিস্তি নিলাম। যাবার বেলা বলছে ‘আবার আসিব ফিরে মাস যাবার আগে পরের কিস্তি নিতে’। যদি কেও একটি মুরগী কেনে, তা বড় হতে, ডিম দিতে, ডিম থেকে বাচ্চা পরে তা বিক্রির যোগ্য হতে তিন থেকে চার মাসের ব্যাপার। যে অর্থ ইনভেস্ট করা হয়েছে বা গ্রামীন ব্যাংক দিয়েছে চার মাসের মধ্যে তো কিস্তি দেয়া সম্ভব নয়? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনে কি ভাবে তারা তাদের সংসার চালায় এবং একই সঙ্গে যারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছে কি ভাবে তা শোধ দেয় সময় মত! হয়ত অনেক পরিবার ছেড়েছে বাড়ি গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ না করতে পেরে। পরিবারের যে একটি দায়িত্ব ছিল তাদের ছেলে-মেয়ে দেখাশোনা করা থেকে শুরু করে আরো সংসারের নানা কাজকর্ম কি অবস্থা তাদের? কত পারসেন্ট লোক গ্রামীন ব্যাংকের লোনের টাকায় সফল হয়েছে? মাইক্রোক্রেডিট: অল্প অর্থ দেয়া হয় কিন্তু কি শর্ত রয়েছে তার পেছনে? অর্থের সঙ্গে শর্তের সামঞ্জস্যতা কেমন এবং কি অবস্থা যারা মাইক্রোক্রেডিটের সঙ্গে জড়িত! স্টকহোল্ডার: সস্তায় কিনে বেশিদামে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা। সুদখোর: কারো বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ানো ভালো কাজ।

কিন্তু সময়মত চুক্তি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ না করতে পারলে আম ছালা দুইই গেল! ফেরিওয়ালা: পাইকারি কিনে পরে অল্প অল্প করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা! প্যাকেজিং: যাই বিক্রি করে তা যতই খারাপ বা ভালো সেটার চেয়ে গুরুত্ব কত সুন্দরভাবে তাকে তুলে ধরা যায়। গুড টু বেটার: যাই হোক না কেন যেভাবে আছে তার চেয়ে আরেকটু সুন্দর করে বিক্রি করতে শেখা! একোলজি: ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক পদ্ধতি। যা যে অবস্থায় আছে তাকে সে ভাবেই বিক্রি করা। ভেজাল: বেশি লাভবান হবার জন্য ভেজাল দিতেই হবে।

মানুষের মরাল ভ্যালুর যে পরিমান বিলুপ্তি ঘটেছে এযুগে, এর আগে এমনটি ঘটেছে বলে মনে হয় না। সবশেষে আমরা যখন সম্পূর্ণভাবে আমাদের জীবন চলার সঠিক পথ ভুলে যাব, ভুলে যাব ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পার্থক্য, তখন ফিরতে বাধ্য হব সত্যের পথে।

আমরা যা কিছু করেছি বা করছি তার সব কিছুতে রয়েছে লোভ, অসততা আর অবিশ্বাস যার কারণে আমরা আমাদের মরাল ভ্যালুর অবনতি গঠিয়ে আলোর জগত থেকে অন্ধকারে চলে এসেছি।

হয়ত এ কারণে আমরা যা ইচ্ছে তাই করছি। সুইডেনে অনেক আগে ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পাওয়া যেত কোন শর্ত ছাড়া। শুধু সময়মত ঋণ পরিশোধ দিলেই হতো। পরে দেখা গেলো ব্যাংকের টাকা দিয়েই গ্রাহক মাসে মাসে ঋণ শোধ দিচ্ছে এবং আসল টাকা বসে বসে খরচ করছে। কোন এক সময় যখন পুরো অর্থ শেষ তখন ব্যাংক বুঝতে পারল যে এভাবে ঋণ দিলে তো ব্যাংক চলবে না! কি করা?

তখন থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত চালু করা হলো। আবার অনেকে বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ব্যাংক থেকে খুবই সামান্য সুদে পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া বাবদ ঋণ নিয়েছে।

লেখাপড়া শেষ করে সুইডেন ছেড়ে তারা তার দেশে বা অন্যদেশে পাড়ি দিয়েছে। ব্যাংকের টাকা শোধ করেনি। এদের অসৎ কর্মের কারণে এখন সুইডিস সিএসএন নিয়ম পরিবর্তন করেছে। মানুষ তার মরাল ভ্যালুর অবনতির কারণে হারাতে শুরু করেছে নৈতিকতা এবং মনুষ্যত্বকে।

বিনিময়ে চালু হতে শুরু হয়েছে সিস্টেম। এখন এ সিস্টেম যদি কলুষিত হয় তখন সমাজে পরিপূর্ণতা লাভ করে দূর্নীতি। যেখানে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে টেকসই সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে সেখানে সব কিছু ভালো মনিটরিংয়ের কারণে দূর্নীতির পরিমান কম দেখা যাচ্ছে।

এখানে আমার ভাবনা থেকে কিছু তথ্য। নতুন প্রযুক্তি এবং সিস্টেমের সমন্বয়ে গ্লোবাল কালচার, চাহিদা, রিলেশন, সততা হবে ভবিষ্যতে বেঁচে এবং টিকে থাকার কৌশল। ফাঁকি দেয়া, অন্যায় কাজ করা, অসৎ পথ অবলম্বন করা, এবং এসবের সঙ্গে আকৃষ্ট হওয়া বিলুপ্ত হবে দিনে দিনে। প্রযুক্তি, সিস্টেম এবং সত্যের সমন্বয়ে সুন্দর উপস্থাপনাই হবে মানবজাতির ফিউচার বিজনেস প্ল্যান। দি সুনার দি বেটার।

লক্ষণীয় যে আমরা বৈজ্ঞানিক উপায়ে অনেক কিছু সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। অনেক কিছু সত্যি হওয়া সত্বেও আমরা তার গুরুত্ব দিচ্ছিনে অনেক ক্ষেত্রে। এর জন্য আমরা তেমন প্রেসারও ক্রিয়েট করছি নে সমাজে। কিন্তু যা আমরা চোখে দেখছিনে, বা সরাসরি বৈজ্ঞানিক কোন সত্যের বিশ্লেষণ নেই, শুধু বিশ্বাস (Faith) ছাড়া। কিভাবে তাকে দিনের পর দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে প্রমান ছাড়া? উপরের বর্ণনায় পরিস্কার যে মানবজাতির কর্মে শতরকম বিনিয়োগ পদ্ধতি রয়েছে এবং যা ব্যবহার হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, যদি আমাদের আচরণ নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তবে কি করে সম্ভব হবে বিশ্বাসকে বিশ্বাসের মাঝে ধরে রাখা?

মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের কারণে বিশ্বাস তার জায়গায় থাকতে পারছে না, পারবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদৌ কি সম্ভব বিশ্বাসকে শক্ত করে ধরে রাখা? উত্তর না। সময় এসেছে ভাবার কী ভাবে বিশ্বস্ততাকে ফিরিয়ে আনা যায়।

ভালো কিছু পেতে হলে খারাপ কিছু ছাড়তে হবে বা বর্জন করতে হবে। আমাদের কর্ম, আচরণ, বিশ্বাস, সুশিক্ষা, মরাল ভ্যালু সবকিছু প্রযুক্তি এবং সিস্টেমের সমন্বয়ে গড়ে উড়বে এবং তাহবে আমাদের উপস্থাপন। আর আমাদের উপস্থাপনার ধরণের উপর নির্ভর করবে উপার্জন। এখন এ উপার্জন সঠিক না বেঠিক তা নির্ভর করবে ব্যক্তির উপস্থাপনার উপর।

মন্তব্য
Loading...