ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

1,594
gb

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট । জিবিনিউজ২৪.কম ||

মুসলিম দাবীদার হয়েও আপনি পূজা দেখতে কিংবা করতে যাবেন, কোন আপত্তি নাই । সংখ্যার ৭ কিংবা ৮ এর অভ্যন্তরেই এ ব্যাপারে আপনার জন্য ফয়সালা নির্ধারিত হবে । আপনি একা কেন পরিবারের আন্ডা-বাচ্চা, ল্যাদা-গেধু, গেধুর মা-খালা-চাচী-মামীর, জ্ঞাতি-গোষ্ঠীশুদ্ধোর সবাইকে নিয়ে পূজা দেখতে যাবেন, চেটেপুটে প্রসাদ খাবেন এতে আপনাকে বারণ করবে কে ? ইচ্ছা হলে, আমাকেও নিজ খরচে নিয়ে যেতে পারেন ! আমি আর বাদ থাকবো কেন ? তবে সাবধান, একবারের জন্যেও বলতে আসবেন না ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ টাইপের কোন কথা । এ বিষয়ে ফতোয়া দেয়ার আপনি কে ? কতটুকু জানেন ধর্ম ? জন্মসূত্রে মুসলিম হয়তো হয়েছেন কিন্তু আমলে কিংবা পালনে আপনি কতটুকু মুসলিম তার প্রমান মেলে যখন আপনার দ্বারা পশ্চিম চিনতে কষ্ট হয় তা দেখে । কাজেই শুধু পূজায় কেন আপনি অনায়াসে কাননবালাদের উৎসব-আস্তানাতেও যেতে পারেন, আপনাকে কেউ হাত ধরে ফিরাবে না কিংবা বাঁধাও দেবে না কিন্তু কোনভাবেই ধর্ম নিয়ে ফতোয়া দিতে আসবেন না; যে ব্যাপারে আপনি অজ্ঞদের কাতারভূক্ত । আপনার মূর্খতা জনে জনে বলে বেড়াবেন না বলেই আশা রাখি ।  

সময়ের সবচেয়ে আলুমার্কা স্লোগান হচ্ছে, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ । সামগ্রিকভাবে এ কথার গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু তা ধর্মের শিক্ষা ও যৌক্তিকতার মানদন্ডে যাচাইয়ের আগে বিভিন্ন ধর্মবলম্বীদের মধ্যে থেকে খাঁটি ধর্মবিশ্বাসীদের এ সম্পর্কে মনোভাব জানা আবশ্যক । নিশ্চয়ই যারা প্রতিষ্ঠিত কোন ধর্ম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তারা কোনভাবেই, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ টাইপের গোঁজামিল আচারের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করবেন না বরং চরমভাবে নিন্দা জানাবেন । কেননা প্রত্যেক ধর্মীয় আচারীয় বিষয়ের স্বকীয়তা ও সাধুতা রয়েছে । এই সমাজের মধ্যে কিছু কিছু মুসলিম নামকাওয়াস্তের আবাল শ্রেণীর যুক্তিবিদ আছে যারা পূজাতে না যাওয়ার জন্য যুক্তি দেখায়, হিন্দুরা যেহেতু মুসলমানদের উৎসবে শামিল হয়না কাজেই মুসলমানদেরও হিন্দুদের কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসব-পার্বণে শামিল হওয়া জায়েজ নাই । এ শ্রেণীর আবালদের কথাশুনে মনে হয়, এর ধর্মের বিশাল পন্ডিত ! আসলে যে কতবড় অপপন্ডিত ও দ্বিচারী তা এদের সাথে না মিশেলে বোঝাই যায়না । এদের হাবভাবে মনে হয়, ইসলাম বোধহয় সাপেক্ষতার ধর্ম ! হিন্দুরা কিংবা অন্যান্য ধর্মবলম্বীরা যদি ইসলামের আচার-উৎসবে শামিল হত তবে এরাও গিয়ে হিন্দু কিংবা অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠীর উৎসবে বদলা দিয়ে তাদের উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দিয়ে আসত, হয়তো ভগবানকেই মাটির কাছাকাছি টেনে আনত । অথচ এই নির্বোধরা জানে না, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন ইসলামের শত্রুরা মুহাম্মদ সা. এর কাছে প্রস্তাব করলো, তোমরা কিছুদিন আমাদের বিশ্বাস মতে উপসনা করবে আর আমরা কিছুদিন তোমাদের আল্লাহের উপসনা করে দিব ! তখন আল্লাহ তা’য়ালা মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে গোটা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন, তোমাদের দ্বীন(ধর্ম এবং এ সংশ্লিষ্ট সব) তোমাদের জন্য আর আমাদের দ্বীন আমাদের জন্য ।

….

বিশ্বের অন্যান্য দেশে যখন সংখ্যালঘুদেরকে নানাভাবে সংখ্যাগুরুরা নির্যাতন-নিপীড়ন করছে তখন ব্যতিক্রম কেবল আমাদের সোনার ও স্বপ্নের বাংলাদেশ । বিশ্বের বুকে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন অনন্য বন্ধনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশ বহি অন্য কোথাও মিলবে-এটা কেউ নিশ্চয়াত্মক ঘোষণায় জানাতে পারবে না । বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে সংখ্যাগুরুদের স্বার্থের চেয়ে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ বেশি গুরুত্বের সাথে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং এটা নিঃসন্দেহে আমাদের গর্বের জায়গা । একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, হিন্দু প্রধান ভারতের পূজামন্ডপগুলো এবং সেখানকার পূজারীরা তাদের ধর্মীয় উৎসব পালনে যেটুকু নিরাপত্তা ও স্বস্তি ভোগ করছে তার চেয়ে ঢের বেশিগুন নিরাপদে আমাদের দেশের হিন্দু সমাজ তাদের ধর্মীয় আচার-উৎসব উদযাপন করছে । অতীতের কোন কোন সময়ে দেশের কিছু স্থানে গুটি কয়েক অনাকাঙ্খিত ঘটনা যে ঘটেনি তা অস্বীকার করলে সত্যের অপনোদন করা হবে কিন্তু অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের হিন্দুজনগোষ্ঠী ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ধর্মগোষ্ঠীরাও নিরাপত্তার চাদরে জড়িয়ে আছে । স্বয়ং রাষ্ট্র এ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব নিয়েছে । পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের সুচারো আয়োজনের জন্য রাষ্ট্র স্বয়ং আর্থিক পৃষ্ঠপোষখ হয়েছে । বিভিন্ন দেশে উগ্রপন্থী হিন্দুদের দ্বারা যখন মুসলিম ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ তাদের ধর্ম ও স্বাধীন চিন্তার চর্চায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তখন আমরা বুকে হাত রেখে গর্বের সাথে বলছি, আমরা হিন্দুসহ অন্যান্য সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি ।

এসব কিছুর পরেও, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এমন দ্বিচারী স্লোগানের কোন স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত ধর্ম-মতের ধর্মীয় বৈধতা নাই কিংবা থাকতেও পারে না । ব্যাপারটি রূচি সাপেক্ষও বটে । কোন মুসলমানের সন্তান পূজা মন্ডপে গিয়ে দেব-দেবীর দর্শন নেবে-দেবে, প্রসাদ চেখে দেখবে কিংবা কোন হিন্দুর সন্তান মুসলিমদের তীর্থস্থান ঘুরে বেড়াবে এতে তাকে কেউ নিষেধ করবে কিংবা প্রতিরোধ গড়বে তেমন ধর্মীয় গোঁড়ামীর বেড়াজালে আমরা আবদ্ধ নেই বটে কিন্তু তাই বলে এটাকে ধর্মীয় খোলস দিয়ে বৈধ করার চেষ্ঠা চরমভাবে ধর্মীয় অজ্ঞানতা ও শিক্ষাসম্পর্কীয় মূর্খতার শামিল । ইসলাম সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনের ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং নিশ্চিত করণে তদারকিও করেছে এবং ধর্মানুসরণ নিয়ে ইসলাম তার অনুসারীদেরকে কোনভাবেই কোনপ্রকার বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছে । তাই বলে এটার দ্বারা এটা বোঝায় না যে, ইচ্ছামত যখন যেটা ভালো লাগবে, পক্ষে থাকবে তখন সেটা করা এবং বলা যাবে । মানুষ কোথায় যাবে, কি করবে সেটা একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত কিন্তু নিজের মনঃপুত কোন সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় খোলস পড়ানোর অপপ্রয়াস নিশ্চয়ই গুরুতর অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে । এই ধরণের অপরাধীরা চরম স্বার্থপর হয় এবং এদের কারণেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশৃঙ্খলা বাসা বাঁধে । খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে, মিষ্টি স্লোগানে ব্যস্তদের মধ্য থেকে কেউ কেউ অতীতে কিংবা এখনো আড়ালে-আবডালে মূর্তি ভাঙায় নেতৃত্ব দেয় । কাজেই আপনার ধর্মের রীতি-রেওয়াজ পালন করবেন কি করবে না সেটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু ধর্মের অপব্যাখ্যা করে, গোঁজামিল দিয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির নৈতিক অধিকার কেউ রাখে না; যাদের ন্যূনতম ধর্মবোধ আছে তারা তো নয়-ই ।