সিলেট বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন

235
gb

জিবি নিউজ 24 ডেস্ক //

সিলেটে গত পাঁচ দিনে দায়ের হওয়া নতুন তিন মামলায় ২৪১ জন আসামি হওয়ার পর এখানকার বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, দলীয় মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী কাজে যুক্ত জেলা ও মহানগর বিএনপির শতাধিক নেতা-কর্মী নিজের বাসাবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকছেন। অনেকে মুঠোফোনও বন্ধ রাখছেন। যদিও আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এখানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার না করার জন্য নির্দেশ ছিল।

সর্বশেষ মামলাটি হয়েছে গত বুধবার দিবাগত রাতে দক্ষিণ সুরমা থানায়। ওই থানার একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) ওপর ককটেল হামলার অভিযোগে ওই কর্মকর্তা বাদী হয়ে করা মামলায় মোট আসামি ৭৩ জন। দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল ফজল জানান, ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেনকে প্রধান আসামি করে এজাহারে ৪৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী বলে জানান সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) এম এ ওয়াহাব।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, বুধবার রাত নয়টার দিকে দক্ষিণ সুরমা থানা থেকে মোটরসাইকেলে করে ফাঁড়িতে যাচ্ছিলেন এসআই আবু রায়হান। মোমিনখলা এলাকায় একদল লোক জড়ো হয়ে তাঁর ওপর ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় তিনটি ককটেল বিস্ফোরিত হয় এবং অবিস্ফোরিত অবস্থায় দুটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে চেষ্টা করেও আবু রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। গতকাল তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) আজবাহার আলী গতকাল  বলেন, ‘তিন দিন আগে এই কর্মকর্তাই আমাদের আসামি ধরেছিল’—এ কথা বলেই হামলাকারীরা আবু রায়হানের ওপর ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে আবু রায়হানের শরীরের সামান্য পুড়ে গেছে। প্রচণ্ড শব্দে তাঁর কানের সমস্যা হয়েছে। তাঁর মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবু রায়হান সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কানের চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা শেষে রাতেই তিনি হাসপাতাল ছেড়েছেন এবং বর্তমানে বিশ্রামে আছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, দক্ষিণ সুরমা এলাকাটা কিছুটা অনুন্নত। সেখানে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশতেহারে ‘পিছিয়ে পড়া দক্ষিণ সুরমার বিষয়ে বাড়তি নজর’ থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এখন সেখানকার নেতা-কর্মীরা ‘দৌড়ের ওপর’ আছেন।

এর আগে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে শাহপরান থানায়। দুটিই হয়েছে গত শনিবার। একটির বাদী পুলিশ, অপরটির বাদী আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন রকম। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে বিএনপির দুই কর্মীকে আটক করা হয়, কিন্তু পুলিশ স্বীকার করছিল না। তাঁদের কোনো খোঁজও মিলছিল না। এরপর শনিবার দুপুরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে পুলিশের উপকমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। ঘণ্টা দুয়েক পর পুলিশ ওই দুই কর্মীকে আটক করে আদালতে পাঠানোর কথা জানালে আরিফুল হক সেখান থেকে ফিরে আসেন। এরপর ওই ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই ফয়েজ আহমেদ বাদী হয়ে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা করেন। তাতে বিএনপির ৩৯ জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তবে আরিফুল হককে আসামি করা হয়নি।

আরিফুল হক  বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে সেখানে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে মামলা করে এখন এই মামলায় অন্যদের হয়রানি করা হচ্ছে।’

আরিফুলকে কেন আসামি করা হলো না, এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে শাহপরান থানার ওসি আখতার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ওই মামলা দায়েরের পর ওই দিনই গভীর রাতে আরিফুল হকের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব আবদুর রাজ্জাকের রায়নগরের বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। তাঁকে না পেয়ে তাঁর ব্যবসায়ী ছেলে রুমন রাজ্জাককে আটক করে এবং পরে পুলিশের করা ওই মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

একই দিন শাহপরান থানায় আরেকটি মামলা করেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ফরিদ আহমদ। আগের রাতে টুলটিকর এলাকায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেওয়ার অভিযোগে করা এই মামলায় বিএনপির ৩৪ জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ দাবি করেন, তিনটি মামলা ও হামলার অভিযোগ সাজানো। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীরা যাতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করতে না পারে, বাড়িঘরে থাকতে না পারে, সে জন্য এসব মামলা করা হচ্ছে।’

বিএনপির অভিযোগকে অসত্য বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের ওপর ককটেল হামলার বিষয়ে আমরা জানি না। এসব দুষ্কৃতকারীরা ঘটাচ্ছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছে।’

বাড়ি বাড়ি অভিযানের অভিযোগ
বিএনপি তাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে পুলিশের অভিযানের অভিযোগ করলেও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেশি নয়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে। তবে বাড়ি বাড়ি অভিযান বা তল্লাশির কারণে নেতা-কর্মীরা বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না বলে দলটির নেতারা দাবি করছেন। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ বেছে বেছে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বাসায় তল্লাশি চালাচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

এর মধ্যে অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া থেকে বাঁচতে বিএনপির নেতা আবদুল হাদী মাসুম ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালাতে গিয়ে আহত হয়েছেন। ভয়ে বাসায়ও ফিরছেন না। তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং ওয়ার্ডে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ও কর্মীদের সংগঠিত করার দায়িত্বে আছেন। তবে আবদুল হাদীর বাসায় অভিযানের কথা অস্বীকার করেন জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম।

শেষ সময়ে উদ্ভূত নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় ভোটের আগেই সিলেটে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। যদি প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশন শক্ত হতে পারত, তাহলে নির্বাচনী পরিবেশ আরও ভালো হতো।