দেশের কিংবদন্তী পুরুষ হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ্ এ এম এস কিবরিয়ার ১৩ তম মৃত্যুবাষির্কী

381
gb

উত্তম কুমার পাল হিমেল,নবীগঞ্জ(হবিগঞ্জ)থেকে  ||
গতকাল ২৭শে জানুয়ারী বাংলাদেশের কিংবদন্তী পুরুষ হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্ এএমএস কিবরিয়ার ১৩ তম মৃত্যুবাষির্কী। বিগত ২০০৫ সালের এই দিনে বিকালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যার বাজারে ঈদ পরবর্তী আওয়ামিলীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভা শেষে ফেরার পথে গেইট দিয়ে বের হওয়ার সময় তাকে লক্ষ্য করে দুস্কৃতিকারীদের নিক্ষেপকৃত দুটি আর্জেস গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হলে চিকিৎসার জন্য প্রথমে হবিগঞ্জ সদর পরে মাধবপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকের অভাবে পরবর্তীতে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা বারডেম হাসপাতালে েিনয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন । তিনি ১৯৩১ সালের ১লা মে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের জালালসাফ গ্রামের এক সম্ভ্রাান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পুরো নাম শমাহ আবু মোহাম্মদ শামসুল কিবরিয়া। তার পিতা শাহ ইমতিয়াজ আলী ছিলেন বৃহত্তর সিলেট অ লের প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত। শাহ এ এম এস কিবরিয়া ছাত্রজীবনে ছিলেন একজন অসাধরন মেধাবী ছাত্র ও তীক্ষè ধীশক্তির অধিকারী। শিক্ষাজীবনে তিনি অনেক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার স্কুল-শিক্ষা শুরু হয় তার পিতার কর্মস্থল মৌলবীবাজর সরকারী হাই স্কুল্ থেকে । ১৯৪২ সালে তিনি ৫ম শ্রেনীতে অধ্যয়নকালে তাঁর পিতাবদলী হন হবিগঞ্জে । তাই তিনি পিতার সাথে হবিগঞ্জ সরকারী হাই স্কুলে এসে আবার ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে তিনি হবিগঞ্জ সরকারী হাই স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে এইচ এস সি পাস করার পর ১৯৫২ সালে ঢাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ১ম শ্রেনীেেত ১ম স্থান অর্জন করে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এ বছরই তিনি দেশের ভাষা আন্দোলনে যোগ দন । ভাষা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারনে তিনি দেড়মাস কারা বরণ করতে হয়েছে। ১৯৫৩ সালে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর পাকিন্তান সরকারের সেন্টাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান বৈদিশিক বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে স্কুল সাব ইনস্পেক্টর হিসেবে তিনি শিক্ষা বিভাগে চাকরি লাভ করেন এবং ডিস্ট্রিক ইনস্পেক্টর হিসেবে অবসর গ্রহন করেন। বৃহত্তর সিলেট অ লে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে তিনি গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখেছেন। পরে শাহ এ এম এস কিবরিয়া পাকিস্তানের কুটনৈতিক মিশনের সদস্য হিসাবে কলকাতা,কায়রো,জাতিসংঘ মিশন,নিইইয়ার্ক,তেহরান এবং জার্কাতায় নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ইসলামাবাদের পররাষ্ট মন্ত্রনালয়ে এবং ওয়াশিংটন ডি,সিতে পাকিস্তান দূতাবাসে নিযুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে শাহ কিবরিয়া ওয়াশিংটন ডি,সিতে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাসে রাজনৈতিক মরাপর্শদাতা হিসাবে চাকুরীরত ছিলেন। পাক দূতাবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেন এবং ১৯৭১ সালের ৪ঠা আগস্ট পাকিস্তান দূতাবাসের চাকুরী ত্যাগ করে চলে আসেন এবং বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখান। তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্নভাবে উদ্যেগী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতার সমর্থনে বিভিন্ন সভা-সমিতির আয়োজন করাসহ লেখাও বক্তৃতায় স্বাধীনতার জোরালো দাবী উপস্থাপন করেন। তিনি মার্কিন সিনেটও কংগ্রেস সদস্যদের সংঙ্গে সাক্ষাত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও গণমাধ্যমের সংঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম বাংলাদেশের পক্ষে কাজ শুরু করেন। ১৯৭২ সালে জানুয়ারীতে তিনি ঢাকায় আসেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নবগঠিত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মহাপরিচালক (রাজনীতি বিষয়ক) পদে যোগদান করেন। ওই বছরেই দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মস্কো সফরকালে তিনি তাঁর অন্যতম সফর সঙ্গী হন। ১৯৭২ সালের ১১ই মার্চ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সচিব পর্যায়ে পদোন্নতি লাভ করেন।। ওই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রশাসনিক পূর্ণগঠন এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে সংগঠিত করার গুরু দায়িত্ব তিনি দক্ষতার সাথে পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি অেেস্ট্রলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালের ফেব্র“য়ারীতে তাকে জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘের ইউরোপিয় দপ্তরে রাষ্ট্রদূত এবং স্থায়ী প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৮ সালে বৈদেশিক সচিব হিসাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।১৯৭৯ সালে ৭৭ জাতি গ্র“ফের প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে ম্যানিলায় আংকটাডের সভায় নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮১ সালের মে মাস থেকে ১৯৯২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কাল কিবরিয়া জাতিসংঘের আন্ডা সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবে এসকাপের নির্বাহী সচিবের পদে অধিষ্টিত হন। জাতিসংঘের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন । ওই বছরেরই সেপ্টস্বর মাসে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগ দেন এবং দলের উপদেষ্টা পরিসদের সদস্য হিসাবে মনোনীত হন। ১৯৯৪ সালে তিনি আওয়ামীলীগ প্রধান আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রেী শেখ হসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী স্টিয়ারিং কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামীলীগ ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন সরকার গঠন করলে তিনি নবগঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং ২০০১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত এ দায়িত্ব খুবই দক্ষতার সাথে পালন করেন। পরে ২০০১ সালের ১লা অক্টোকরের অস্টম সংসদ নির্বাচনে তিনি হবিগঞ্জ ৩ (হবিগঞ্জ সদর-লাখাই) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য অর্থাৎ এমপি নির্বাচিত হন। বিগত ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারী বিকালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যার বাজারে ইদ পরবর্তী আওয়ামিলীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভা শেষে ফেরার পথে গেইট দিয়ে বের হওয়ার সময় তাকে লক্ষ্য করে দুস্কৃতিকারীদের নিক্ষেপকৃত দুটি আর্জেস গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হলে চিকিৎসার জন্য প্রথমে হবিগঞ্জ সদর পরে মাধবপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকের অভাবে পরবর্তীতে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা বারডেম হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন। প্রয়াত কিবরিয়ার একমাত্র পুত্র ড. রেজা কিবরিয়া একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ এবং কন্যা ড. নাজলী কিবরিয়া বোস্টন ইউনিভারসিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধাান হিসাবে কর্মরত। তার সহধর্মীনি প্রয়াত আসমা কিবরিয়া ব্যক্তিগত জীবনে একজন চিত্রকর ছিলেন। অসাধারন মেধার অধিকারী দেশের একজন সফল অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মৃত্যুতে হবিগঞ্জ তথা বৃহত্তর সিলেটের যে ক্ষতি হয়েছে তা আজ পর্যন্ত পূরন হয়নি।