যেভাবে ভিয়েতনাম ছেড়ে পালিয়েছিল মার্কিন সেনারা

240
gb

জিবিনিউজ24 ডেস্ক:১৯৭৫ সালের ৩০শে এপ্রিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে।উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বাহিনী দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গনের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে।তিন দিক থেকে তারা ঘিরে রেখেছে পুরো নগরী। অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের সায়গন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটন এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারেন ৪০ বছর আগে ৩০ এপ্রিলের সেই দিনটির কথা।’আমরা আর মাত্র ছয়জন সেখানে আছি। মেরিন সেনাদের বাদ দিয়ে যারা তখনো দূতাবাসের দেয়ালগুলো পাহারা দিচ্ছে। তারপর আমি একসময় দূতাবাস ভবনের ছাদের দিকে তাকালাম। দেখলাম একটা হেলিকপ্টার সেখান থেকে উড়ে যাচ্ছে।  আমি ভাবলাম, আমারো কি ওই হেলিকপ্টারে পালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল?’সায়গনের মার্কিন দূতাবাসে তখনো বহু মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায়।তাদের মধ্যে রয়েছেন কয়েক শ দক্ষিণ ভিয়েতনামী, যারা মার্কিনীদের সহায়তা করেছে। কিন্তু এদেরকে রেখেই নিজের পালানোর কথা ভাবতে হলো ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটনকে।’ভিয়েতনামে যে আমরা কত জীবন অপচয় করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ভিয়েতনাম ছেড়ে পালাতে হচ্ছে। সেই মুহূর্তে অবশ্য এসব ভাবনা আমার মাথায় কাজ করছিল না। কারণ তখন আমরা পালানোর আয়োজন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এসব ভাবনা ফিরে আসলো পরে। এই পুরো ভিয়েতনাম যুদ্ধের মানেটা কী দাঁড়ালো, কী ভীষণ ট্রাজিক এবং দুঃখজনক পুরো ব্যাপারটা, একেবারে শেষ মুহূর্তে সেই চিন্তা করছিলাম আমরা। ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তরের কমিউনিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী যে পরাজিত হতে যাচ্ছে, সেটা এর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বুঝতে পারছিলেন ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটন। কমিউনিস্ট বাহিনী তখন সায়গনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। হাজার হাজার মানুষ পালাচ্ছে।যদি সায়গনের পতন হয়, তাহলে মার্কিনীদের সহকর্মী ভিয়েতনামীদের ভাগ্যে কি ঘটবে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন স্টু হেরিংটন। কারণ যেসব ভিয়েতনামী মার্কিনীদের সহায়তা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের নির্মম প্রতিশোধের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন।  সায়গনের পতন। ট্যাংক নিয়ে নগরীতে ঢুকছে ভিয়েতকং গেরিলারা। সায়গনের মার্কিন দূতাবাসের কূটনীতিকরা তাদের প্রস্থানের যে পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, সেখানে এই ভিয়েতনামীদের ব্যাপারে কী করা হবে- তার কোন উল্লেখ নেই। স্বাভাবিকভাবেই স্টু হেরিংটন এবং সেনাবাহিনীর অন্য কর্মকর্তারা এদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন:’সেসময় ভিয়েতনামে আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন গ্রেয়াম মার্টিন। আর সবার মতো তিনিও কিন্তু তখন পর্যন্ত ঘটনার গুরুত্ব আর সেখান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন মোটেই বুঝতে পারছিলেন না বা বুঝলেও তা স্বীকার করতে চাইছিলেন না। ইভাকুয়েশন শব্দটা তখন কেউ ভুলেও উচ্চারণ করছে না। কারণ কূটনীতিকরা মনে করছিলেন, এরকম উদ্ধার অভিযানের কথা ভাবা মানেই হচ্ছে নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া। এরকম চিন্তাকে মোটেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। ‘সায়গন থেকে সবাইকে আকাশপথে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা, তার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড। পেন্টাগন থেকে শেষ পর্যন্ত এই সংকেত এলো ২৯শে এপ্রিল বিকেলে।

‘দূতাবাসের গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই প্রথম যে বিষয়টা আমার চোখে পড়লো, তা হলো সেখানে প্রচুর লোক। পুরো কম্পাউন্ডজুড়ে, প্রত্যেকটি ভবনে, প্রত্যেকটি অফিসে গিজ গিজ করছে মানুষ। প্রায় আড়াই হাজার মানুষ, এদের বেশিরভাগই ভিয়েতনামী। ‘পুরো মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ডজুড়ে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। এর মধ্যে কিভাবে তারা উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করলেন?

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস মিডওয়ে তখন ভিয়েতনামের উপকূলের দিকে ছুটছে। তবে এই জাহাজে তখন যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে বহন করা হচ্ছে অনেকগুলো হেলিকপ্টার। নৌবাহিনীর অফিসার ভার্ন জাম্পার ছিলেন সেই জাহাজে।’আমেরিকার বিমানবাহী জাহাজ ‘ইউএসএস মিডওয়ে’ থেকে যত হেলিকপ্টার উঠছিল আর নামছিল, সেগুলোর দায়িত্বে ছিলাম আমি। ‌আমিই ছিলাম এই পুরো অপারেশনের কর্তা। ‘

‘আমরা আমাদের এয়ারফোর্স ক্রুদের বললাম, তারা কেবল দিনের বেলাতেই বিমান নিয়ে উড়তে পারবে। রাতে বিমান চালানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নিয়ম আমাদের ভাঙতে হয়েছিল। সূর্যাস্তের পর সারা রাত ধরে এসব বিমানে লোক আনা হয়েছে।

হ্যাঁ, এটা সত্যি। অনেক হেলিকপ্টারের জ্বালানি প্রায় ফুরিয়ে আসছিল। যদি এর মধ্যে কোনো একটা জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে জাহাজের ডেকে বিধ্বস্ত হতো, তাহলে কিন্তু বহু লোক মারা যেতে পারতো। কিন্তু আমি আপনাকে বলতে পারি, একজন মানুষও মারা যায়নি। সেখানে অনেক ছোট বাচ্চা ছিল। এরা ফ্লাইট ডেকের ওপর দিয়ে ছোটাছুটি করছিল। কিন্তু তাদের সবাই অক্ষত ছিল। এটি আসলেই বিস্ময়কর এক ঘটনা। ‘

আকাশ পথে যখন হেলিকপ্টারগুলো উড়ে আসছে, তখন আরো হাজার হাজার মানুষ তীরে এসে ভিড় করেছে। এরা অনেকে জেলে নৌকায় চড়ে পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সমূদ্রে নোঙর করা মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের দিকে যাচ্ছে।

‘হেলিকপ্টার কিন্তু ভীষণভাবে কাঁপে এবং প্রচুর শব্দ তৈরি করে। যারা কোনোদিন হেলিকপ্টারে চড়েননি, তারা কিন্তু ভয় পাবেন। এই যে শত শত লোক হেলিকপ্টারে চড়ে আসছিল, তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তারা কতটা বিচলিত। এরা নিজেদের দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, কিন্তু তারা জানে না, তাদের সামনে কি আছে। ‘

ইউএসএস মিডওয়ে যখন এরকম পালিয়ে আসা মানুষে পরিপূর্ণ, তখন সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণের মতো ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়লো। তখন জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে, এমন কিছু হেলিকপ্টার তাদের সমূদ্র ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।

‘না, আমাদের মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। আমাদের যে কোনো একটা এইচ ফিফটি থ্রি হেলিকপ্টারে গড়ে ৫০ জন লোক থাকে। আমরা তখন ভাবছি, একটা হেলিকপ্টারের মূল্য হচ্ছে ৫০ জন মানুষের জীবন। কাজেই আমাদের কারো মনেই কোনো দ্বিধা ছিল না। ‘

৩০শে এপ্রিল ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে এক নতুন নির্দেশ এসে পৌঁছালো। মার্কিন মেরিন কমান্ডোদের বলা হলো, ভিয়েতনামী সহকর্মীদের উদ্ধারের চেষ্টা বাদ দিয়ে তাদের এখন প্রত্যেক মার্কিন নাগরিককে নিয়ে সায়গন ছাড়তে হবে। মার্কিন দূতাবাসে তখনো ৪২০ জন ভিয়েতনামী উদ্ধারের অপেক্ষায়। তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে স্টু হেরিংটন সবাইকে ফেলে রওনা হলেন ছাদে অপেক্ষমান এক হেলিকপ্টারের দিকে:

আমি একটা অজুহাত খুঁজে বের করলাম। আমি বললাম, আমাকে প্রস্রাব করতে যেতে হবে। আমি দূতাবাস ভবনের ভেতরে ঢুকে ছাদে উঠলাম। সেখানে একটি হেলিকপ্টার ছিল। সেই হেলিকপ্টারেও ৫০ জনের মতো ভিয়েতনামীর জায়গা হতে পারতো। কিন্তু ভোর সাড়ে ৫টায় এটি আকাশে উড়লো আমিসহ পাঁচজনকে নিয়ে। তখনো ৪২০ জন ভিয়েতনামী দূতাবাসে উদ্ধারের অপেক্ষায়। দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক কূটনীতিকও সেখানে রয়েছেন। এরা সবাই পার্কিং লটে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তাদের রেখেই প্রায় শূন্য এক হেলিকপ্টারে আমরা সেখান থেকে চলে এলাম।

‘আমার নিজেকে অসুস্থ মনে হচ্ছিল। আমার মন এতটাই বিক্ষিপ্ত ছিল যে, আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল। এই লোকগুলোকে আমি কথা দিয়েছিলাম, তাদের সবার ব্যবস্থা করে তারপর আমি দূতাবাস ছাড়বো। সারারাত ধরে বহুবার আমি তাদের এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কথা আমরা রাখিনি। ‘

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওই শেষ কয়েকদিনে সাত হাজারের বেশি মানুষকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছিল সায়গন থেকে। সেদিন যারা এই উদ্ধার অভিযান চালিয়েছিলেন, তাদের বীরত্বগাঁথা কিন্তু ঢাকা পড়ে গেল মার্কিনীদের গ্লানিময় পরাজয়ের খবরের আড়ালে। সায়গনের মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ড থেকে শেষ মার্কিন হেলিকপ্টার আকাশে উড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটি দখল করে নিল কমিউনিস্ট বাহিনী। সেদিনই কমিউনিস্টরা সায়গনের নতুন নামকরণ করলো ‘হো চি মিন সিটি’।

‘তাদের রেখেই আমরা সেখান থেকে চলে এলাম। ওদের দেওয়া কথা আমি যে রাখতে পারিনি, সেটি ছিল খুবই বেদনাদায়ক। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বিষাদময় ঘটনা। ‘

স্টু হেরিংটন এবং ভার্ন জাম্পার, দুজনই মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সফল ক্যারিয়ার শেষে অবসর নিয়েছেন। ভার্ন জাম্পার এখন সান ডিয়েগোতে ইউএসএস মিডওয়ে মিউজিয়ামে পর্যটকদের জন্য ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করেন।