Bangla Newspaper

মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি : প্রধানমন্ত্রী

0 15

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানবিক কারণে আমরা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। তবে এই সমস্যার সৃষ্টির জন্য দায়ি মিয়ানমার সরকারকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবো। গতকাল সোমবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ বা খ্রীষ্টান তা আমরা দেখিনি, আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিক কারণেই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। আমরা তো অমানুষ ও অমানবিক হতে পারি না বলেই সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

তিনি বলেন, অবশ্যই বাংলাদেশে আসা তাদের প্রত্যেক নাগরিককে মিয়ানমার সরকারকে ফেরত নিতে হবে। প্রয়োজনে মিয়ানমারে সেফ জোন সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে এদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের দেশেরই নাগরিক।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভোগের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেউ যেন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা না করে।

 

আবার কেউ যেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়া বা ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার চেষ্টা না করে। সাহায্য বা সহযোগিতা না করে কেউ বড় বড় স্টেটমেন্ট দেবেন, সেটি হবে না। আমরা দেশের ১৬ কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি। আর এই ৪/৫ লাখ লোকের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ক্ষমতাও আমাদের রয়েছে। সত্যিকার যারা এসেছে তাদের আইডেনটিটি থাকবে, ছবি থাকবে।

সাময়িকভাবে তাদের আশ্রয় দেয়া ব্যবস্থা নিয়েছি। এটা সাময়িক ব্যবস্থা। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এই ইস্যুটি জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে জোরালোভাবে তুলে ধরার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক। ১৯৫৪ সালেই মিয়ানমারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাসহ দেশটির সকল ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে সমান অধিকার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে এখন তাদের দেশ থেকে বিতাড়ণ করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করা হচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

গোটা বিশ্ব বিবেকের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে এ ঘটনা। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে গত কয়েক দিনে কয়েক লাখ মানুষ এদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। অত্যাচারের যে চিত্র দেখলাম তা বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। এটা তো সবাই জানে।

১৯৭৪ সালে মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা তাদের অধিকার কেড়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। ৮১ ও ৮২ সালে তারা যে আইন করে সেখানে চার স্তর বিশিষ্ট সিটিজেনশিপ চালু করে। এর উদ্দ্যেশ্য ছিলো তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া। একটা জাতির ওপর মিয়ানমানর সরকার এ ধরণের আচরণ কেন করছে তা জানি না।

আমরা বারবার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রতিবাদ করছি। আমি যে কয়বার মিয়ানমার সফর করেছি তাদের বলেছি আপনারা আপনাদের নাগরিক আমাদের দেশ থেকে ফিরিয়ে নিন। ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা। তারা উল্টো তাদের ওপর অত্যাচার চালাতে লাগলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১২ সালে ও ২০১৬ সালে দুষ্কৃতকারিরা তাদের পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এর জেরে সাধারণ মানুষদের ওপর অত্যাচার চালানো শুরু করে। শিশুর লাশ নাফ নদীতে ভাসছে। গুলি খাওয়া মানুষ আছে। মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। আমরা তো মানুষ। তাদেরকে আশ্রয়ে নিষেধ করবো কিভাবে? আমাদের তো অভজ্ঞিতা রয়েছে।

১৯৭১ সালে আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানীরা যে ঘটনা ঘটিয়েছিলো সেসব চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আমরা তো ভুক্তভোগী ছিলাম। আমিও তো ৬ বছর ধরে রিফিউজি হয়ে ছিলাম। রিফিউজি হয়ে থাকার কষ্ট আমরা জানি। তাই এদের আশ্রয় দিয়েছি মানবিক কারণে, অন্য কোন কারণে নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চাই। মিয়ানমার সরকারকে বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া, হঠাৎ রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার ফলাফল কি হতে পারে সেটা কি তারা চিন্তা করছে।

তিনি বলেন, আমরা কখনই এ ধরণের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করবো না। উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামে অশান্ত পরিবেশ ছিলো। ৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমরা সেখানে শান্তিচুক্তি করি। এই অশান্ত পরিবেশ মোকাবেলা করতে সামরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হতো। ১৯৮১ সালে এসে ঘোষণা দিয়েছিলোম এটা সামরিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে হবে। পরে সরকারে এসে আমরা শান্তিচুক্তি করি। তাদেরকে পুনর্বাসন করি।

শেখ হাসিনা বলেন, অন্য দেশে রিফিউজি থাকা মোটেই সম্মানজনক নয়। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যতবার আমার কথা হয়েছে, তাদেরকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বলেছি। এ বিষয়ে তাদেরকে আমরা সহযোগিতা করতে পারি। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। আমাদের পররাষ্ট্র সচিব বারবার তাদের ওখানে গেছেন আলোচনা করেছেন। এখন তারা এমন অবস্থা তৈরি করেছে যে বিশ্ব বিবেক নাড়া দিয়েছে। নাফ নদীতে শিশুদের লাশ কেন? সমস্ত মুসলিম উম্মাহ যদি এটা অনুভব করতে পারতো তাহলে আজ এ ধরণের ঘটনা ঘটতো না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মিয়ানমারের পুলিশ ব্যারাকে হামলা চালিয়েছে তারা কি অর্জন করছে? তারা এটা কি বোঝে না তাদের কারণে আজ লাখ লাখ মানুষের ওপর পাশবিক অত্যাচার হচ্ছে। এ অবস্থা কেন তারা সৃষ্টি করে দিচ্ছে। যারা তাদের অস্ত্র জোগান দিচ্ছে হয়তো তারা লাভবান হচ্ছে। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে আজ মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিক কষ্ট পাচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন আমি বলেছি, প্রয়োজনে যৌথভাবে কাজ করতে পারি। মিয়ানমারকে এটা বুঝতে হবে। শিশুরা নারীরা কি অপরাধ করেছে? এটা আমরা মানতে পারি না। মানতে চাই না। যারা বাংরাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে সেইফ জোন করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

Comments
Loading...