Bangla Newspaper

‘আঁর মা কোডে?’, ইংল্যান্ড থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরে দ্বীন

402

জিবিনিউজ24 ডেস্ক ||  দিন শেষে সবাই নিজ ঘরে ফিরে যেতে চায়। ফিরতে চান দ্বীন মোহাম্মদ নূরও। নিজ ঘরে ফিরতে না পারলেও বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বাবা মায়ের কাছে ফিরে এসেছেন দ্বীন মোহাম্মদ নূর। প্রায় সাত বছর পর দেখা হলো বাবা-মায়ের সঙ্গে।দ্বীন মোহাম্মদ নূর যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ডের ট্যাক্সিচালক। ২০১০ সালে শরণার্থী শিবির থেকে দ্বীন মোহাম্মদ যুক্তরাজ্যে চলে যান। চেয়েছিলেন নিজের পরিবারকেও নিয়ে যেতে। এতদিন পর সন্তানকে কাছে পেয়ে কেঁদে ওঠেন বাবা-মা। তিনি নিজেও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বলতে থাকেন ‘আঁর মা কোডে’?দ্বীন বলেন, “বিমানবন্দরে নেমে আমি একটা সিমকার্ড নিই আর সরাসরি আমার মাকে কল করি। আমি বলি, ‘মা আমি তোমার ছেলে, দ্বীন মোহাম্মদ নূর। আমি বাংলাদেশে বিমানবন্দরে আছি।’ মা বলে ওঠে, ‘সত্যি?’ আমি বোধহয় পৃথিবীর সবচাইতে সৌভাগ্যবান ছেলে, যে শরণার্থী শিবিরে সাত বছর পর তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে পারছি।’যুক্তরাজ্যে অতিবাহিত তাঁর জীবন নিয়েও বলেন দ্বীন। তিনি বলেন, ‘একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বলে আমাদের মানুষ হিসেবে কোনো অধিকার নেই। এটা খুব সৌভাগ্যের বিষয় যে আমি এখানে একজন ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করছি। আমি সব সময় নানা রকম মানুষের সাথে পরিচিত হই। যুক্তরাজ্যের মানুষেরা অসাধারণ। তাঁরা খুব উপকারী।’

দ্বীন শরণার্থী জীবনের কথা, নিজের দেশকে হারানোর বেদনাদায়ক স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে আমার স্বজনদের হারিয়েছি। নিজের গ্রাম হারিয়েছি। চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছি। আমি আমার পরিবারের সাথে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কেননা, শরণার্থী জীবনকে জীবন বলা যায় না। তাঁরা বলেছিল ব্রাডফোর্ড হলো মানুষের জন্যে আশ্রয়স্থল, কেন না ব্রাডফোর্ড শরণার্থীদের স্বাগত জানায় যারা নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।’

যুক্তরাজ্যের মানুষের সঙ্গেও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন দ্বীন মোহাম্মদ। কখনো তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পান। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আমি চুপ করে থাকি। কিন্তু কখনো যাত্রীদের বলি আমার দেশ সম্পর্কে, আমার মানুষগুলো সম্পর্কে, যা ঘটে গেছে তা নিয়ে। বলি, আমার অনুভূতির কথা। তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করেন। আমাকে আরো কঠোর পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করেন।’

তবে নিজের মানুষগুলোর জন্য এবার কিছু করতে চান দ্বীন। তাদের সহায়তা করতে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে। তিনি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাংলাদেশে যাওয়ার। কেননা আমাদের মানুষগুলোর সহায়তা প্রয়োজন। তাদের হয়তো শীতের পোশাক প্রয়োজন হতে পারে। তাদের হয়তো ঘুমানোর জায়গা নেই, খাদ্য নেই। আমি আমার স্বজনদের সঙ্গে, আমার বাবা-মাকে দেখতে বাংলাদেশে এসেছি। ২০১০-এ যাওয়ার পর এটাই প্রথম আমার বাংলাদেশে আসা। আমি খুব আনন্দিত। আমাদের বাবা-মায়ের, স্বজনদের সেখানে কিছুই নেই। তারা মেঝেতে ঘুমায়।’

শরণার্থী শিবিরে কঠিন জীবন অতিবাহিত করলেও ছেলের ফিরে আশায় হাসি ফুটেছে বাবা-মায়ের মুখে। এতদিন না খেয়ে থাকলেও ছেলের জন্যে আজ মুরগির তরকারি রান্না করছেন মা। দ্বীন মোহাম্মদের মা বলেন, ‘আমাদের জীবন এখানে খুবই কঠিন। নুন দিয়ে পানি দিয়ে কোনোরকমে এক বেলা খাবার খাই। মাছ-তরকারি কিনতে পারি না তাই, লবণ মিশিয়ে খাই। এভাবেই জীবন কাটাচ্ছি। আমার ছেলে এসেছে তাই, মুরগির তরকারি রান্না করেছি।’

এবার নিজ দেশে, নিজ গৃহে ফিরে যেতে চান দ্বীন মোহাম্মদ নূর। একজন মানুষ হিসেবে সব অধিকার নিয়ে বাস করতে চান নিজ দেশে। তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই জানি না, কেন আমাদের মানুষগুলো এই ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আমাদের মানুষগুলোর জন্য একটা সমাধান চাই। আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই। আমরা সব ধরনের মানবাধিকার নিয়ে দেশে ফিরে যেতে চাই, অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মতো।’

Comments
Loading...