জিবিনিউজ ডেস্ক: সাভারে গোলাপ ফুলের হাট জমজমাট। হাটের নাম কাশেম মার্কেট। দূর-দূরান্ত থেকে গোলাপ ব্যবসায়ীরা ফুল কিনতে আসেন এ হাটে। এলাকার লাল মাটিতে তুলনামূলক বড় সাইজের গোলাপ ফুল চাষে ঝুঁকছেন সাভারের প্রান্তিক চাষীরা। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে গোলাপ চাষীর সংখ্যা। দুই শতাধিক ফুল চাষী এখন গোলাপ ফুল চাষ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করে বয়ে এনেছেন সাভারের সুনাম। ফুল ভালোবাসেন না জগতে এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। সাধারণত কোনো অনুষ্ঠান এবং দিবসগুলোতে কাঁচা ফুলের চাহিদা বেড়ে যায় অনেক গুণ। ফুল উত্পাদনে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় এসব চাষীদের। সার ও গোলাপ বীজের মূল্যবৃদ্ধিতে উত্পাদন ব্যয় কিছুটা বাড়লেও থেমে নেই তাদের পথচলা। তাদের জীবন সংগ্রামে কোনো বাধাই যেন বাধা নয়। অদম্য উত্সাহে ক্লান্তিহীন পরিশ্রমও যেন হার মানে তাদের কাছে, যখন ফুলে ফুলে ভরে যায় গোটা বাগান। তারপরও সরকারের পক্ষ থেকে কিছুটা সহযোগিতা পেলে এ ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিয়ে ভূমিকা রাখতে পারে রাজস্ব আয়ে।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য ব্যবসায়ী এসে ভিড় জমায় বিরুলিয়া ইউনিয়নের শ্যামপুরে কাশেম মার্কেটের সামনে। ধীরে ধীরে জমে ওঠে ফুলের বেচাকেনা। নামটি কাশেম মার্কেট হলেও মূলত সেখানে কোনো মার্কেটের চিহ্ন নেই। কাশেমের চায়ের দোকানের সামনে হাটটি বসার কারণে ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে স্থানটি কাশেম মার্কেট হিসেবে পরিচিত। ক্ষুদ্র চাষীরা তাদের ফুলগুলো বিক্রি করে দেন বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা এসেও হাট থেকে ফুল ক্রয় করেন। প্রতি রাতে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকার বেচাকেনা হয় এ হাটে। বড় ব্যবসায়ীরা ফুল কিনে জড়ো করে পরে তা বিক্রির উদ্দেশ্যে ঢাকার শাহবাগে নিয়ে যান।
সাভার উপজেলার মাটি ফুলের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। সাধারণত পাকা মিলন, মেরেন্ডি, লিঙ্কন এবং সাদা জাতের গোলাপের উত্পাদন অনেক ভালো হলেও লাভজনক হওয়ায় মেরেন্ডি জাতের গোলাপই বেশি চাষ করে থাকেন এখানকার ফুল চাষীরা। ১৯৮০-৮২ সালের দিকে হল্যান্ড থেকে এ জাতের ফুল বীজ এনে রাজধানীর মিরপুরস্থ বোটানিক্যাল গার্ডেনে রোপণ করা হয়। তখন থেকেই এর শুরু। ১৯৮৫-৮৬ সালের গোড়ার দিকে সেখানকার এক গবেষক সাভারের সাদউল্লাহপুর মোস্তাপাড়া গ্রামে এর বীজ রোপণ করেন। তারপর থেকে এখানে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় গোলাপ ফুলের ব্যবসা। পরে তা সাভারের আশুলিয়া, বিরুলিয়া, রাজাশন, কাতলাপুর, মানিকগঞ্জের সিংগাইরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রামের নাম মোইস্তাপাড়া। সাভার উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাদউল্লাহপুরে। রাজধানী ঢাকার অতি সন্নিকটে হলেও ভৌগোলিক কারণে নানাবিধ সুবিধাবঞ্চিত এ এলাকার জনগণ। প্রায় ৩শ’ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে গ্রামটিতে। জমি আবাদি হলেও শাকসবজির তুলনায় এখানকার চাষীরা সিংহভাগ জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করছেন। শ্যামপুরে প্রতি রাতেই বসে গোলাপের হাট। সব বয়সীরাই সেখানে ফুল কাটার পর একে একে তাদের বাগানের ফুলগুলো নিয়ে আসে হাটে। শ্যামপুরে কাশেম মার্কেটের সামনে সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় ফুল ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। সাভার উপজেলা ক্ষুদ্র ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনসার আলী জানান, প্রায় ২০ বছর আগে তিনি এ ব্যবসা শুরু করেন। তখন উপজেলার হাতেগোনা কয়েক ব্যক্তি ফুল চাষে নিয়োজিত ছিল। লাভজনকের পাশাপাশি সম্মানজনক হওয়ায় পরে এ ব্যবসা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। এখন কমপক্ষে দুইশ’ ফুল চাষী এ ব্যবসায় জড়িয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে এ ব্যবসাকে স্থায়িত্ব এবং ধরে রাখতে
একটি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রান্তিক ফুল চাষী সত্তরোর্ধ শাহজাহান মিয়া জানান, প্রায় দুই যুগ ধরে এ ব্যবসা করছেন তিনি। এ ব্যবসা তিনি শুরু করলেও এখন তার ছেলে এ ব্যবসার দেখভাল করছেন। তিনি বলেন, গোলাপ ফুল চাষ লাভজনক হলেও প্রতি বছর এর চারা পুলিং কাট করা হয়। পুলিং কাটের মাধ্যমে চারা উত্পাদনের সময় এক ধরনের পোকার আক্রমণে অনেক চারা মারা যায়। অনেক চেষ্টা করেও এর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। সহায়তা পাওয়া যায়নি কৃষি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও। এছাড়াও আগে যেখানে ১০ বস্তা সারের দাম ছিল মাত্র ২ হাজার টাকা, এখন গুনতে হয় ১২ হাজার টাকা। পাশাপাশি ফুল বাগানে নিয়োগকৃত কর্মীদের রোজও (দৈনিক হাজিরার টাকা) বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত এ কারণেই উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
বিরুলিয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য (ইউপি সদস্য) মোঃ ছামাদ মোল্লা জানান, এ ব্যবসায় সহস্রাধিক পরিবার ওেপ্রাতভাবে জড়িত। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ ব্যবসা আরও বিস্তৃত করা যেত। বাগান থেকে ফুল কাটার পর বিক্রির লক্ষ্যে যখন তা শাহবাগ নিয়ে যেতে হয় স্থায়ী কোনো স্থান না থাকায়, তখন অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রাজধানীর শাহবাগে ফুল চাষীদের জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সাভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইস উদ্দিন ভূঁইয়া শাহীন জানান, সাভার উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার হেক্টর পতিত জমি রয়েছে যেখানে কৃষি চাষ হয়। এর মধ্যে প্রায় ১শ’ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হলেও এর সিংহভাগ জমিতেই গোলাপ ফুলের চাষ হয়ে থাকে। সাভারের ফুল এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফুল চাষ করে হয়েছেন অনেকে স্বাবলম্বী।
ভাগ্যও বদলেছে অনেকের। অনেক ভোগান্তি থাকা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য উত্সাহে এগিয়ে চলেছেন চাষীরা। আগামীতে ফুল উত্পাদনের পর তা বিদেশে রফতানি করতে সংশ্লিষ্টদের এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




