এম.শাহীন গোলদার,সাতক্ষীরা :
বিশ্ব খ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নিভৃতে লুকিয়ে আছে দেশী বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষন করার মত একটি দর্শনীয় স্থান মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। কিন্তু লোকালয় থেকে অনেক দূরে হওয়ায় কারনে যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভালো না হওয়ায় এবং পর্যটকদের থাকার কোন ব্যবস্থা না থাকায় এ সমুদ্র সৈকতটি তেমন পরিচিতি লাভ করেনি। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি থেকে মান্দর বাড়িয়া পর্যন্ত যাওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে পর্যটনের নতুন দিক উন্মোচিত হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। বন, সৈকত আর সমুদ্র একই সাথে তিন প্রকৃতির রুপে মুগ্ধ হবেন দেশী বিদেশী পর্যটকরা। সরকারী বা বেসরকারী ভাবে উদ্যোগী হয়ে মান্দার বাড়িয়া সৈকতে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজ করা হলে এই দ্বীপটি দেশের অন্য যে কোন দর্শনীয় স্থানকে হার মানাবে।
সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবনে লুকিয়ে থাকা মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজ করে দেশের পর্যটন শিল্পের নতুন দিক উম্মোচিত করা হোক এ দাবী এ দ্বীপে ঘুরতে আসা সকল পর্যটকদের। বিশ্ব ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ একক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। প্রায় ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তন জুড়ে সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট জেলার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত, যা দেশের মোট বন অঞ্চলের ৪৪ শতাংশ। গাছ-পালা, পশু, পাখি, সরিসৃপ, মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যতা ও নদ নদীতে বিস্তৃত সুন্দরবনের বনভূমি ও জলরাশিতে রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভুমি ও সম্পদে ভরপুর এ অরণ্যে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী, সরীসৃপ ৩৫ প্রজাতীর, স্থন্যপায়ী ৪২ প্রজাতির, পাখি ৩১৫ প্রজাতির, সাদা মাছ ২১০ প্রজাতির চিংড়ী ২৬ প্রজাতির কাঁকড়া ১৩ প্রজাতির, ৪২ প্রজাতির মালাস্কা, ১ প্রজাতির লবেস্টার। সুন্দরবন শুধু জীব বৈচিত্রের উৎস নয়। বন্যপ্রাণী, নদ-নদী ও জলজ মৎস্যের অবাধ বিচরন ক্ষেত্র। সারা বছরই এখানে আসে দেশী বিদেশী পর্যটকরা। তবে শীতের আগমনের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের পদচারনা। সুন্দরবনের নয়না ভিরাম এ দৃশ্য উপভোগ ও জীব বৈচিত্র দেখার জন্যে অসংখ্য প্রকৃতি প্রেমিকরা ছুটে আসে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব অর্জনে অন্যান্য বনের তুলনায় সুন্দরবনের অবদান সবার শীর্ষে। খুব বেশি আগের কথা নয় যখন সুন্দরবনকে মানুষ ভয় পেত, কিন্তু এখন প্রকৃতি প্রেমিক দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিচরন অনেকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটকদের জন্য পশ্চিম বন বিভাগ সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া, দোবেকী, মান্দার বাড়ীয়া, পুটনি আইল্যান্ড (বিবিরমেদে) কালিরচর, পুষ্পকাটি, নোটাবেঁকী, জলঘাটা, কাকা দোবেকীসহ কয়েকটি স্পট ও রুট পর্যটকদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান হলো মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। এখানে একবার এলে বার বার আসার জন্য আর্কষন করবে এই সমুদ্র সৈকত। কিন্তু এই সমুদ্র সৈকতে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো লঞ্চ অথবা ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা ট্রলার। এখানে রাত্রি যাপনের কোন ব্যবস্থা না থাকার কারনে সন্ধ্যার আগে সবাইকে ফিরে আসতে হয়। তাছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় নির্দিষ্ট পরিবহনে রাত্রীযাপন ও রিতিমত ঝুকিপূর্ন। প্রলয়ংকরি ঘূর্নিঝড় সিডরের আঘাতে বন বিভাগের মান্দার বাড়িয়া অফিসটি ভবনসহ সাগরের গর্ভে বিলিন হয়ে যায়। তারপরে অদ্যবধি সেখানে বন বিভাগের কোন অফিস স্থাপন না করায় বা কোন তদরকি না থাকায় একেবারে অরক্ষিত রয়েছে মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। তাছাড়া সরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকায় কোন পর্যটন শিল্প গড়ে না উঠায় দর্শনীয় মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকত অজানা থেকে যাচ্ছে দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে। সরকারীভাবে পর্যটকদের সুন্দরবন দেখার সার্বিক ব্যবস্থা না থাকার কারনে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব।মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে ঘুরে আসা একজন নারী সংবাদিক ফারহানা শাহরীন ফারিয়া জানান, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের শেষ সীমানায় এমন একটি সমুদ্র সৈকত আছে সেখানে না গেলে বুঝতে পারতাম না। কিন্ত যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভালো না হওয়ায় সবার পক্ষে এই দর্শনীয় সমুদ্র সৈকতে সাধারনের পক্ষে যাওয়া খুবই দূরহ। তিনি বলেন সহজ যোগাযোগ ও থাকার ব্যবস্থা করা গেলে মান্দার বাড়িয়া সমুদ্র সৈকত দেশী বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষন করার মত একটি দর্শনীয় স্থান হতে পারে। তিনি সরকারি পৃষ্টপোষকতায় মান্দার বাড়িয়াকে আরও দর্শনীয় করে তোলার দাবি জানান।
মুন্সিগঞ্জ কলবাড়ীতে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সমৃদ্ধ বরসা রিসোর্ট ও টুরিজম এর স্বত্তাধিকারী আনিছুর রহমান জানায়, সরকারের সহযোগীতা ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্দ্যেগে এ শিল্পের প্রসার ঘটান সম্ভব না। সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি, প্রবেশ অনুমতির জটিলতা নিরসন করা জরুরী। তিনি আরো বলেন, বনদস্যুদের ভয়ে পর্যটকদের চাহিদামত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখান সম্ভব হয় না। বন বিভাগ থেকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেওয়া হয় তা নাম মাত্র। মাত্র ২ জন করে এফ,জি (ফরেষ্ট গার্ড) দেওয়া হয় প্রতিটি পর্যটকবাহী জলযানে। দুই জন এফ,জি দিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়। ফলে মান্দার বাড়িয়ার মত দর্শনীয় সমুদ্র সৈকতে ভ্রমন করতে পারছে না পর্যটকরা।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহির উদ্দিন বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে দেশি-বিদেশী পর্যটকরা এখন প্রচুর ভিড় জমাচ্ছে। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়ছে। তবে লোকবল স্বল্পতা ও লজেস্টিক সাপোর্ট এর ঘাটতির কারণে পর্যটকদের উপযুক্ত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তিনি আরো বলেন, যদি পর্যটকদের আবাসিক ব্যবস্থা ও তাদের নিরাপত্তার জন্যে পর্যাপ্ত গার্ড ও প্রশিক্ষিত গাইড এর ব্যবস্থা করা যায়, তবে সুন্দরবন ভ্রমনকারীদের আগ্রহ অনেক বেড়ে যাবে। সর্বপোরি বিশেষজ্ঞদের মতে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত, অবকাঠামো নির্মাণসহ সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে উপকূলীয় অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নূয়ন হবে। তাছাড়া সুন্দরবনের সম্পদের উপর নির্ভরতা কমবে। এতে প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, সংরক্ষন হবে জীব বৈচিত্র, বৃদ্ধি পাবে দেশী-বিদেশী পর্যটক। যা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং বিশ্বের কাছে দেশের পরিচিতি বৃদ্ধিসহ পর্যটন শিল্পে সুন্দরবন হতে পারে বিশ্বের অন্যতম। ###
এম.শাহীন গোলদার,সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
০১৭১১০২৯৮২৪




