এক-দুই করে টানা ১৬ দিনে গড়ালো শাহবাগের গণজাগরণ। দিন যত যাচ্ছে তারুণ্যের জোরালো কণ্ঠে ততই তেজোদ্দীপ্ত হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি। দিনে তপ্ত রোদ আর রাতে কুয়াশা ঝরানো হিমহাওয়া উপেক্ষা করেই হাজারো মানুষ অবস্থান করছেন প্রজন্ম চত্বরে। এই দাবির বাস্তবায়ন না দেখে ক্ষান্ত হচ্ছে না শাহবাগমুখী গণজোয়ার। বরং সারাদেশে এই গণজাগরণ ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন আন্দোলনের উদ্যোক্তারা। আগামীকাল প্রজন্ম চত্বরে মহাসমাবেশ থেকে এ লক্ষ্যে নতুন কর্মসূচিও আসতে পারে। অর্ধমাসের টানা এ আন্দোলনে প্রতিদিনই শরিক হচ্ছেন অগণিত মানুষ। অভিন্ন দাবিতে বিভিন্ন বয়সের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের কণ্ঠে যেন ক্লান্তি নেই। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত কণ্ঠের জোরালো সেস্নাগানের তেঁজ আরো বাড়ছেই। এদিকে গত সোমবার আন্দোলনে সস্নোগান দিতে দিতে হৃদরোগে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণকারী বস্নগার ও কার্টুনিস্ট তারিকুল ইসলাম শান্তকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রজন্ম চত্বরের সহযোদ্ধারা। এ সময় শান্তর জন্য বনানী কবরস্থানে স্থায়ী কবর চাওয়ার পাশাপাশি তার মৃত্যু থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে দ্বিতীয় প্রজন্মের এই শহীদকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। আজ বিকাল ৪টা ১৩ মিনিটে শহীদদের উদ্দেশে চিঠি লিখে বেলুন ওড়ানোর কর্মসূািচ পালন করা হবে। প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবারও জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যদিয়ে শুরু হয় ১৫তম দিনের কর্মসূচি। ভোর সাড়ে ৬টায় সবার কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনিত হয় ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি……’। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে যান। যোগ দেন সারারাত জেগে থাকা মানুষও। এছাড়াও দিনের প্রথম প্রহরেই চত্বরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ চলে আসেন। বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে চলেছেন গণজাগরণ মঞ্চের এই নেতাকর্মীরা। সেস্নাগান, গান আর কবিতায় দিনরাত চাঙ্গা করে রেখেছেন শাহবাগের মোহনা। রাতভর সেস্নাগান দেয়া কণ্ঠগুলোতে কিছুটা ক্লান্তি দেখা দিলেও- সেসব কণ্ঠেই আবারো ঝরছে অগি্নঝরা সব সেস্নাগান। আন্দোলনের আবেদন কমেনি এতটুকু। কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা আগের মতোই। আর তাদের সেস্নাগানে তাল মিলিয়ে জেগে উঠছেন বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা। গণজাগরণ মঞ্চের ১৫তম দিনের আন্দোলন শুরু হওয়ার কিছু সময় পরই কার্টুনিস্ট ও নির্মাতা তারিকুল ইসলাম শান্তর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আনা হয়। কেন্দ্রীয় মসজিদের বাইরের অংশে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে নিহতের দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। এ সময় শান্তর পরিবারের সদস্য ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, ঝুনা চৌধুরী, নির্মাতা গাজী রাকায়েত, জোনায়েদ সাকী, বস্নগার ডা. ইমরান এইচ সরকারসহ বস্নগার ও নাট্যাঙ্গনের কর্মীরা জানাজায় অংশ নেন। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় পশ্চিম নাখালপাড়া রেলগেইট মসজিদে শান্তর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। গত সোমবার দুপুরে শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে সেস্নাগান দিতে দিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তারিকুল। পরে প্রজন্ম চত্বরসংলগ্ন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হলে শান্তর মৃত্যু হয়। ঢাবি মসজিদের জানাজা শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে শান্তর ভাই শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শান্ত আর তিনি একসঙ্গে বড় হয়েছেন। বলা যায়- মুদ্রার এপিট-ওপিট। শান্ত যতক্ষণ পাশে থাকত কখনো কষ্ট অনুভূত হত না। যেমন কাজপাগল ছিল, তেমনি ছিল বন্ধুসুলভ। এ সময় তিনি শান্তর জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি শান্ত নির্মিত নাটক ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ পুনঃপ্রচার করার আহ্বান জানান। বড় বোন মাহমুদা ইকবাল বলেন, ‘শুধু এতটুকুই বলব, এরকম ভাই যেন বাংলাদেশের প্রতিটা বোনের ভাগ্যে জোটে।’ অন্য বোন ফাতেমা আহমেদ ছন্দা বলেন, ‘শান্তদের মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি হৃদয়ে বেঁচে থাকবে শান্ত- মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, শান্ত দীর্ঘসময় ধরে কখনো লিখে, কখনো প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে আবার কখনো নাটকের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছেন। এ আন্দোলন সফল হলেই তার আত্মা শান্তি পাবে। অভিনেতা মামুনুর রশীদ বলেন, শান্তর মৃত্যু খুবই হৃদয়বিদারক। মুক্তিযুদ্ধ শান্তর হৃদয়ে একটি গভীর জায়গা দখল করেছিল। শান্ত সেস্নাগান দিতে দিতে মারা গেছেন, এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। তিনি আরো বলেন, গণআন্দোলন শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত তিনজনকে হারাতে হয়েছে। মৃত্যুবরণকারী সবাইকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, শান্তর মৃত্যুতে সবাই মর্মাহত। কারণ আন্দোলনের আরো একজন সহযোদ্ধাকে হারাতে হলো। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে মানুষের আবেগ কতটা গভীর, সেস্নাগান দিতে দিতে শান্তর মৃত্যু তা আবারো প্রমাণ করেছে। শান্তর মৃত্যু বৃথা যেতে না দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। জানাজায় অংশ নিতে প্রজন্ম চত্বর থেকে বস্নগার ও আন্দোলনের অনেক কর্মীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সমবেত হয়েছিলেন। এ সময় তার স্মরণে প্রজন্ম চত্বরে নীরবতা পালন করা হয়। এছাড়া জানাজা শেষে শান্তর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে প্রজন্ম চত্বরে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বস্নগার ডা. ইমরান এইচ সরকার সাংবাদিকদের বলেন, শান্ত আমাদের আন্দোলনের সহযোদ্ধা ছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে সবাই গভীরভাবে শোকাহত। তিনি শান্তর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার আত্মার মাগফিরাত কমনা করেন। আন্দোলন সম্পর্কে ইমরান বলেন, এটা চলমান আন্দোলন। আন্দোলনে একের পর এক সহযোদ্ধাদের হারালেও এটি থামবার আন্দোলন নয়। শত বাধা সত্ত্বেও আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন তিনি। আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে গতকাল বিকালে গণজাগরণ মঞ্চে আসেন ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি। এ সময় তিনি বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই জামায়াত এ দেশের বিরোধিতা করছে। পাপের কারণেই আজ তাদের গণআন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, এবার বাংলাদেশকে যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারমুক্ত করার সময় এসেছে। এজন্য গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। তিনি এ গণআন্দোলন অবিরাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এরপর দেশের কৃতী ফুটবলার আরিফ খান জয় প্রজন্ম চত্বরের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিজয় সুনিশ্চিত। আজ শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম যেভাবে জেগেছে, তাতে বিজয় অবশ্যম্ভাবী। এরপর মঞ্চে সংহতি প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধারা নতুন মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছেন। এ যুদ্ধ নিশ্চয়ই নতুন বাংলাদেশ গড়বে। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের বিবেক কোনোদিন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তারা যুদ্ধাপরাদীদের ফাঁসি দেখেই ক্ষান্ত হবেন। রাজীব হত্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এক রাজীবকে হারালেও হাজারো রাজীব ঘরে ঘরে জেগে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যার পরও দেশে কোটি মুজিব তৈরি হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের সব যুদ্ধাপরাধীকে নিশ্চিহ্ন করার আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তরুণদের মধ্যে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে তা কেউ দমাতে পারবে না। এজন্য সবসময় চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে। যে কোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেউ ঠেকাতে পারবে না। বক্তৃতা শেষে ‘এক রাজীব লোকান্তরে, লাখো রাজীব ঘরে ঘরে,’ রাজীব তোমার রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’ বলে সস্নোগাণ তোলেন তিনি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে গণহত্যায় জড়িত থাকার পরও ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ায় ওইদিন সন্ধ্যা থেকে বস্নগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষুব্ধ তরুণরা শাহবাগে অবস্থান নেন, যা একে একে আজ অর্ধমাসে গড়ালো। ৫ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের শুরু থেকে খুন হওয়া রাজীবসহ এ পর্যন্ত তিনজন আন্দোলনকারী মৃত্যুবরণ করেছেন। শাহবাগের গণজাগরণমঞ্চ থেকে নিহতদের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে।যাযাদি ।




