‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটির মধ্য দিয়ে কোটি মানুষের মাঝে আজো বেঁচে আছেন শহীদ সঙ্গীতব্যক্তিত্ব আলতাফ মাহমুদ। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ওপর আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা এ গানের সুর করেন তিনি। গানটি ২১ ফেব্রুয়ারিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মুখে মুখে পরিবেশিত হয়। আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তার মেয়ে শাওন মাহমুদ
বাবার সঙ্গে কাটানো সময়গুলোর কথা খুব বেশি মনে নেই। কারণ, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। তবে মা ও পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে বাবার কথা শুনেছি। মা আমাকে প্রায়ই বলতেন- আমি নাকি বাবার মতো হয়েছি। আমার কথা, আচার-আচরণ, চলাফেরা সব কিছুতেই নাকি বাবার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। অথচ, বাবা যখন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যান, তখন আমি খুব ছোট। মায়ের মুখ থেকে যতটুকু জেনেছি, অবসরের সময়গুলোতে বাবা আমায় নিয়ে খোশগল্পে মেতে থাকতেন। বাবা আমাকে অনেক আদর করতেন। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে আমাদের বাসায় মুক্তিসেনাদের ঘাঁটি ছিল। বাবার বন্ধুরা এবং অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের বাসায় আড্ডা দিতেন। এ আড্ডা থেকেই বিভিন্ন অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। প্রয়াত জহির রায়হান, শহিদুল্লাহ কায়সারসহ আরো অনেকেই আমাদের বাসায় নিয়মিত আসতেন। আমাকে তারাও বেশ আদর করতেন। প্রায় প্রতিদিনই বাসায় গানের আসর বসত। আমরা তখন ঢাকার আউটার সার্কুলার রোডে থাকতাম। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পাকবাহিনীরা বাবাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আর বাবার কোনো খোঁজ পাইনি। বাবা ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ‘৫২ থেকে ‘৭১-এর আন্দোলনগুলোতে বাবা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। বাবা মাছ খেতে বেশ পছন্দ করতেন। তাই প্রায়ই তিনি গাড়ি নিয়ে আরিচা ও মাওয়া ঘাটে চলে যেতেন। এরপর বস্তা ভরে মাছ নিয়ে এসে মাকে রাঁধতে বলতেন। এরপর তার যত বন্ধু-বান্ধব ছিল সবাইকে খাওয়ার টেবিলে দাওয়াত করতেন। একসঙ্গে সবাইকে নিয়ে খেতে বসতেন। বাবার কথাতেই বোঝা যেত, সবাইকে নিয়ে খাবার খেতে তিনি কতটা ভালোবাসতেন। এরপর রাতে বাবা ও তার বন্ধুরা গান এবং আড্ডার ঝড় তুলতেন। বাবা বেশ ভালো বেহালা ও বাঁশি বাজাতে পারতেন। তার বেহালার সুর শুনতে পাশের অনেকেই আমাদের বাড়িতে ভিড় করতেন। বাবার ছবি অাঁকার হাতও বেশ পাকা ছিল। সেই সময়ে বাবার অাঁকা অনেক ছবি দিয়ে আমাদের ঘর সাজানো হয়েছিল। গ্রাম-বাংলার প্রতি বাবার ঝোঁক ছিল লক্ষণীয়। সময় পেলেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি গ্রামের পথে বেড়াতে যেতেন। বাবা যখন হারিয়ে যান, তখন তার বয়স ছিল ৩৮ বছর। সঙ্গীতের প্রতি বাবার প্রবল নেশা ছিল। ছোটবেলা থেকেই বাবা নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি গণসঙ্গীতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বরিশালের এক জনসভায় ‘ম্যায় ভূখা হু’ গানটি গেয়ে বাবার নাম রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে। বাবা যতগুলো গান গেয়েছেন, তার সবগুলোতেই দেশ-মা ও মাটির প্রেম মেশানো রয়েছে। বাবার সুর করা অনেক গানই প্রশংসিত হয়েছে। ‘৫২ সালটা স্বাধিকারের জন্য জাতিকে উজ্জীবিত করার সময় ছিল। বাবার সুরে সুরেই সেই সময় জাতির হৃদয়ে স্পন্দন বেড়ে ওঠেছিল। বাবার কথা এখনো আমার বেশ মনে পড়ে। তাকে না পাওয়ার দুঃখ বুকের মাঝে এখনো নাড়া দিয়ে ওঠে। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে যখন দেখি, লাখো মানুষ খালি পায়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে এক সুরে গেয়ে ওঠেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ তখন আমার বেশ আনন্দ লাগে। বাবা এখনো এ দেশের সব মানুষের মাঝে বেঁচে আছেন।যাযাদি।




